
আজকের পৃথিবীতে যে স্বাস্থ্য সমস্যাটি সবচেয়ে দ্রুত হারে ছড়িয়ে পড়ছে, সেটি হলো স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন। এটি এখন আর কেবল সৌন্দর্যহানির সমস্যা নয়, বরং অনেক রকম ভয়ঙ্কর রোগের দরজা খুলে দেওয়া এক নিঃশব্দ ঘাতক রোগ।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় স্থূলতা হলো শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমা হওয়া, যা স্বাভাবিক বিপাকীয় কার্যকলাপকে ব্যাহত করে এবং নানা ধরনের জটিল রোগের জন্ম দেয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট বলছে, পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ বর্তমানে স্থূলতার শিকার। শুধু প্রাপ্তবয়স্ক নয়, অল্পবয়সী শিশুদের মধ্যেও এ সমস্যা দ্রুতহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতদিন ধরে আমেরিকাই তো মোটা মানুষের রাজধানী ছিল। কিন্তু এখন আমাদের দেশটিও আমেরিকার সেই গৌরব ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য খুব দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে।
এই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হবার পেছনে মূল কারণই হলো এখনকার খাবারের ধরন এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। এখনকার মানুষ শারীরিক পরিশ্রম প্রায় করে না বললেই চলে। অথচ খাবার খাওয়ার সময় একেবারে কুম্ভকর্ণ হয়ে যায়। মাত্রাতিরিক্ত শর্করা, প্রক্রিয়াজাত খাবার, প্রোটিন, ভিটামিন ও মিনারেলের ঘাটতি– এই ওজন বেড়ে যাওয়ার পেছনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে চলেছে। কারণ যাইহোক, এই সবকিছু মিলিয়েই যে আমাদের বাড়তি ওজন আজ এক মহামারির রূপ নিয়ে ফেলেছে, তাতে তো আর কোনো সন্দেহই নেই।
স্থূলতার ফলে যে সমস্যাগুলো সবচেয়ে বেশি দেখা দেয়—
ডায়াবেটিস টাইপ–২: অতিরিক্ত চর্বি শরীরে ইনসুলিন প্রতিরোধ তৈরি করে। এরফলে খুব তাড়াতাড়ি মানুষের শরীরে সুগার বেড়ে যায়। আক্রান্ত হয়ে পড়ে ডায়াবেটিসে।
হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপ: রক্তনালীতে চর্বি জমে ধমনীর দেওয়াল সংকুচিত হয়ে যায়। এতে করে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।
ফ্যাটি লিভার ও কিডনির ক্ষতি: স্থুলতা বেড়ে গেলে লিভারের মধ্যেও চর্বি জমে যায়। এরফলে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হয়।
জয়েন্টের ব্যথা ও হাড় ক্ষয়: বাড়তি ওজন শরীরের ভার বাড়িয়ে দেয়। এরফলে হাড়ের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। হাড় ও জয়েন্টে জয়েন্টে ইনফ্লেমেশন তৈরি হয়। হাড় ও জয়েন্টের ব্যথা বাড়তেই থাকে।
ঘুমের ব্যাঘাত ও মানসিক চাপ: স্থূলতার সঙ্গে স্লিপ অ্যাপনিয়া, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা ও ডিপ্রেশনও জড়িত। যে কারণে অধিকাংশ মোটা মানুষই ঘুমের সমস্যায় ভোগেন। এতে তাদের মানসিক চাপও অনেক বেশি বৃদ্ধি পায়।
এই বাড়তি ওজন শুধু নানা রকম রোগই নয়, স্থূলতা মানুষের আয়ুষ্কালও কমিয়ে দেয়। শরীরের প্রতিটি অঙ্গকে বাড়তি ওজন বহন করতে গিয়ে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক দ্রুত ক্ষয় হতে হয়। একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, স্থূল মানুষের গড় আয়ু স্বাভাবিক ওজনের মানুষের চেয়ে ৭ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
তাহলে প্রশ্ন হলো—সমাধান কোথায় ?
সমাধান অবশ্যই আছে। এই সমাধানের পথ দেখানোর জন্যই আমার এই লেখা। এই ধারাবাহিক লেখার মাধ্যমে আপনারা জানতে পারবেন, কীভাবে ক্ষুধার জ্বালায় কষ্ট না পেয়েও খুব সহজভাবে শরীরের বাড়তি ওজন কমানো যায়। আজকাল ইউটিউব থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক বড় বড় প্যাথিস্টরা ওজন কমানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের ডায়েট প্ল্যান দেয়। বাস্তবতা হচ্ছে এসব প্ল্যান ফলো করে কেউই ওজন কমাতে পারে না। যেগুলো প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়, সেগুলোও আসলে তাদের ব্র্যান্ড প্রচার করার বিজ্ঞাপন ছাড়া আর কিছুই না।
আমি এখানে কোনো ধরনের ব্র্যান্ড বিক্রি করতে আসিনি। আমি এসেছি আপনাদের ওজন কমানোর সত্যিকারের উপায় কী — সেই সম্পর্কে একদম সঠিক এবং সহজ রাস্তা দেখিয়ে দিতে। এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসতে পারে সেটা কীভাবে এবং কতদিনে ?
কীভাবে ওজন কমানো যাবে সেটা অবশ্যই জানতে পারবেন। তবে আমি গেরান্টি দিয়ে বলে রাখছি — যদি আমার পরামর্শ অনুযায়ী নিজের লাইফস্টাইল চেঞ্জ করতে পারেন তাহলে মাত্র এক মাসের মধ্যেই অন্তত দশ কেজি পর্যন্ত ওজন কমাতে সক্ষম হবেন।
এই অসাধ্য সাধন করা কীভাবে সম্ভব হবে সেটা জানতে চাইলে ফলো করতে থাকুন আমাকে। আমি কোনো রকম ফাঁকা বুলি আওড়াই না। আমার ওজন ৯৬ কেজি ছিল। হাই প্রেশার ছিল, ডায়াবেটিস ছিল, ফ্যাটি লিভার ছিল, কিডনির সমস্যা ছিল, হার্ট ব্লকেজ ছিল। রোজ প্রায় তিনশো টাকার ওষুধ খেতে হতো। এখন আমি ৬৪ কেজিতে নেমে এসেছি এবং সেটা গত আড়াই বছর ধরে বজায় রেখে চলেছি। এখন আর আমার কোনো রোগ নেই। একটাও টেবলেট খেতে হয় না।
আমি যেই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, সেটা একান্তভাবেই আমার নিজের অভিজ্ঞতা। এবার সময় এসেছে সেটা সবার সঙ্গে শেয়ার করার। সুতরাং ভরসা এবং বিশ্বাস রাখুন, ঠকবেন না
# ওজন কমানো মানে চর্বি কমানো
ওজন কমানো মানে শরীরের চর্বির পরিমাণ কমানো। শরীরের মাসল মাস কমানো আমাদের লক্ষ্য নয়। একজন মানুষ যদি নিয়মিত ব্যায়াম করার মাধ্যমে শরীরের মধ্যে মাসল বিল্ডাপ করে তার পেশির ওজন বাড়িয়ে তোলে, সেটাকে কখনোই আনহেলদি ওজন বলা যাবে না। আনহেলদি ওজন হচ্ছে সেটাই, যেটা শরীরের মধ্যে চর্বি হিসেবে জমা হয়েছে। শরীরের জন্য চর্বি অবশ্যই দরকার আছে। কিন্তু সেই চর্বির পরিমাণ কখনোই এমন হওয়া উচিত নয় যাতে ওজন বেড়ে যায়। চর্বি জমে ওজন বাড়া মানেই সব ধরনের মেটাবলিক ডিজঅর্ডারকে আমন্ত্রণ করে আনা। তাই ওজন কমানোর মূল লক্ষ্য হচ্ছে শরীরের অপ্রয়োজনীয় চর্বিগুলোকে পুড়িয়ে ফেলা।
একজন মানুষের স্বাভাবিক ওজন নির্ভর করে তার উচ্চতা কতটুকু সেটার উপর। আপনি যদি একজন পুরুষ মানুষ হন, তাহলে আপনার উচ্চতাকে সেন্টিমিটারে মাপুন। ধরে নিন আপনার উচ্চতা ১৭০ সেন্টিমিটার। এর থেকে ১০০ মাইনাস করলে যা আসবে সেই সংখ্যাটাই কেজি হিসেবে আপনার স্বাভাবিক ওজন হবে। অর্থাৎ ১৭০ – ১০০ = ৭০ কেজি।
আর যদি আপনি মহিলা হন, তাহলে আপনার উচ্চতার সংখ্যা থেকে ১০৫ মাইনাস করতে হবে। ধরুন আপনার উচ্চতা ১৬০ সেন্টিমিটার। এর থেকে ১০৫ মাইনাস করুন। ১৬০ – ১০৫ = ৫৫। মানে আপনার স্বাভাবিক ওজন হওয়া উচিত ৫৫ কেজি।
এই স্বাভাবিক ওজনের অতিরিক্ত যে ওজনটা রয়েছে, সেটাই মূলত অপ্রয়োজনীয় চর্বি। এই চর্বিকে গলিয়ে ফেলার নামই ওজন কমানো।
মানুষের শরীরে ওজন কেন বাড়ে, অর্থাৎ চর্বি কেন জমে, সেই বিষয়টি না জানলে আমাদের ওজন কমানোর জার্নিটা সঠিকভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে না।
মানুষের শরীর হচ্ছে বিধাতার সৃষ্টি করা এক অটোহিলিং স্মার্ট ডিভাইস। যে কোনো রকম বিপরীত পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকার জন্য তার মধ্যে অটোমেটিক হিলিং প্রসেস কাজ করে। সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ খাদ্যাভাবের শিকার হয়ে এসেছে। মন্বন্তরের সময় দিনের পর দিন মানুষকে না খেয়ে থাকতে হয়েছিল। তখন মানুষ কীভাবে বেঁচে থেকেছিল জানেন? এই হিলিং প্রসেস থাকার জন্যই মানুষ খেতে না পেয়েও রক্ষা পেয়েছিল।
সৃষ্টিকর্তা মানুষের দেহের মধ্যে ফ্যাট সেল দিয়ে রেখেছেন, যাতে দুঃসময়ে বেঁচে থাকার জন্য সেখানে সঞ্চিত শক্তি চর্বি আকারে জমা থাকতে পারে। এজন্যই লিভারের কাছাকাছি অঞ্চল অর্থাৎ পেটের নিচের দিকে বেশি করে চর্বি জমা হয়। এই চর্বি আসলে আমাদের সেই সঞ্চিত শক্তি, যা মন্বন্তরের সময়ে লিভারের সাহায্যে শক্তি হিসেবে রূপান্তরিত হয়ে শরীরের ফাংশন ঠিক রাখার কাজে ব্যবহৃত হবার কথা। কিন্তু এখনকার দিনে তো মন্বন্তর অর্থাৎ না খেয়ে থাকার মতো পরিস্থিতি আসেই না। উল্টে মানুষ খাবারের উপর খাবার খায়।
ধরুন, সকালের ব্রেকফাস্টে কেউ পাঁচশ ক্যালরি খাবার খেলো। এই ক্যালোরি খরচ হবার আগেই আবার লাঞ্চ করে ফেলে। সেই লাঞ্চের মাধ্যমে হয়তো আরও দুই হাজার ক্যালোরি ঢুকে গেল। এরপর সন্ধ্যায় আবার ফাস্টফুড থেকে হাজার খানেক ক্যালোরি ইনটেক করা হয়ে গেল। এরপর রাতের ডিনার। তখন যদি একদম কমিয়েও খাবার খাওয়া হয়, তবুও পাঁচশ ক্যালোরি তো হবেই। অন্যদিকে সারাদিনের পরিশ্রমের তালিকা ধরলে দেখা যাবে মেরেকেটে দুই হাজার ক্যালোরিও খরচ হয়েছে কিনা সন্দেহ।
তাহলে হিসাবটা কী দাঁড়াল? সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চার হাজার ক্যালোরি শরীরের ব্যাঙ্কের মধ্যে জমা করা হলো। আর খরচ হয়েছে মাত্র দুই হাজার ক্যালোরি। তাহলে স্টকের খাতায় আরও দুই হাজার নতুন ক্যালোরি জমা হয়ে গেল। এভাবেই দিন প্রতিদিন অতিরিক্ত ক্যালোরি শরীরের মধ্যে ঢুকতে থাকে আর চর্বি হিসাবে জমা হতে থাকে।
এর সঙ্গে যুক্ত আছে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, থাইরয়েডের সমস্যা, কর্টিসোল (স্ট্রেস হরমোন), ঘুমের ঘাটতি এবং ঘন ঘন খাবার খাওয়ার অভ্যাস। প্রতিবার খাবার খাওয়ার সময় ইনসুলিন নিঃসৃত হয়, আর যত বেশি ইনসুলিন বের হয় তত বেশি চর্বি জমে।
তাই ওজন কমানো মানে কেবল ডায়েট নয়, বরং এক নতুন লাইফস্টাইলের পরিবর্তন। যখন আমরা শরীরকে তার প্রাকৃতিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনি, তখন শরীর নিজেই চর্বি পোড়ানো শুরু করে দেয়।
পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে আমরা জানব — শরীরে চর্বি কেন জমে, কীভাবে শরীরের বিপাকীয় হার বাড়িয়ে স্বাভাবিক উপায়ে ফ্যাট কমানো যায়। কারণ সত্যি কথাটা হলো, চর্বি খেলেই চর্বি হয় — এই কথাটি সম্পূর্ণ মিথ্যে। আসল সমস্যা চর্বিতে নয়, অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেটে।
