এক শিকড় থেকে উদ্ভূত তিনটি পথ বা রিলিজিয়ন ইহুদি, খ্রিস্টান ও ইসলামকেই আব্রাহামিক রিলিজিয়ন বা ধর্ম বলা হয়। একই পূর্বপুরুষ ইব্রাহিম বা আব্রাহাম থেকে উদ্ভূত হয়েছে এই তিনটি ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক বংশ; তবুও তাদের মধ্যে কেন এত ভাঙন, কেন এত রক্তপাত, এত শত্রুতা কেন ? এই বিষয়টি জানতে হলে ইহুদি, খৃস্টান ও ইসলাম ধর্মের নবয়ুতের বিষয়টি সম্পর্কে জানতে হবে। নবুয়ত মানে নবী বা প্রফেট পদমর্যাদার একজন ব্যক্তি। নবয়ুতের উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধের বীজ রোপিত হয়েছে মূলত এই তিনটি ধর্মমতের তিনজন প্রবর্তককে কেন্দ্র করে। এঁরা হলেন মোযেস, যীশু, ও মুহাম্মদ।
১) মোযেস এবং ইহুদি ধর্ম
প্রায় চার হাজার বছর আগে মোযেস এলেন, তোরাহ (ওল্ড টেস্টামেন্ট) আনলেন। ইহুদিদের মুক্ত করলেন দাসত্ব থেকে। তিনি বললেন, “আমার পরে আরেক জন আসবে।” অর্থাৎ তিনি ঈশ্বরের শেষ বাণী দিয়ে দিয়েছেন এমনটা দাবি করেননি, বরং অপেক্ষার বীজ বপন করলেন। এরফলে ইহুদিরা পরবর্তী মশীহার জন্য অপেক্ষায় রইল।
২) যীশু এবং খৃস্টান ধর্ম
দেড় হাজার বছর পরে এলেন যীশু। তিনি বললেন, “আমিই ঐশ্বরিক আইনের পূর্ণতা। ঈশ্বরের রাজ্য এখন মানুষের হৃদয়ে।” তিনি তাঁর বাণীগুলো দিলেন নিউ টেস্টামেন্ট হিসেবে – যা পরবর্তীতে বাইবেল হিসাবে খ্যাত হয়। তিনিও বললেন, “আরো একজন আসবে পরবর্তীতে।” কিন্তু ইহুদিরা তাঁকে মানলো না। তারা বলল – “না, তিনি আমাদের প্রতিশ্রুত মশীহ নন।” এর ফলেই খ্রিস্টধর্ম শুরু হলো, সেইসাথে শুরু হলো ইহুদি–খ্রিস্টান বিভাজন।
৩) মুহাম্মদ এবং ইসলাম
এর মাত্র ৫৭০ বছর পর এলেন মুহাম্মদ। কুরআন শরীফ আসলো। তিনি বললেন, “এই কোরআনই চূড়ান্ত সত্য। আমিই শেষ নবী। এরপর আর কেউ আসবে না।” এখানেই নবুয়তের দরজা বন্ধ করে দিলেন। এতে করে নতুন আরেকটি কেন্দ্র তৈরি হলো – যেখানে যীশুকে নবী হিসাবে মানা হলেও, তাঁকে ঈশ্বরের সন্তান বলে স্বীকার করা হলো না। আর খ্রিস্টকে অস্বীকার করলে কুফর বলা হলো।
এই তিনটি রিলিজিয়নের মূল লড়াই হচ্ছে প্রেরিতের বৈধতা নিয়ে। হুদিরা বলল – যীশু মিথ্যা। খ্রিস্টানরা বলল – যীশুই সত্য, মুহাম্মদ নন। মুসলমানরা বলল – সবাই সত্য, কিন্তু মুহাম্মদই “চূড়ান্ত।” এরপর আর কেউ নেই। একই ঈশ্বর, একই নবুয়তের ঐতিহ্য, কিন্তু সত্যের শেষ আসন কে পাবে – এই নিয়ে দ্বন্দ্ব। প্রশ্নটা হচ্ছে নবুয়তের দরজা বন্ধ নাকি খোলা ? মোযেস দরজা খোলা রাখলেন। যীশুও খোলা রাখলেন। কিন্তু মুহাম্মদ দরজা বন্ধ করে দিলেন। এই “দরজা বন্ধ” ঘোষণাই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংঘর্ষের মূল কারণ।
একটা ভবিষ্যদ্বাণীকে পুঁজি করেই তিনটি ধর্ম গড়ে উঠেছিল। কিন্তু শেষ সত্য কে বলবে – এই দখলদারি থেকেই শুরু হল বিরোধ, বিভক্তি ও রক্তপাত। এক ঈশ্বরের নামে তিনটি পথ, তিনটি গ্রন্থ, আর অসীম বিভাজন – এটাই আব্রাহামিক ধর্মের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।
ছাত্র ও Student — দুই শব্দ, এক আত্মা | Yogi Krishnadev Nath
ছাত্র ও Student — দুই শব্দ, এক আত্মা মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে শিক্ষা কখনো কেবল পুঁথিগত বিষয় ছিল না, বরং তা ছিল এক সাধনা — আত্মাকে শুদ্ধ করার, সত্যকে উপলব্ধি করার। এই সাধনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এক অনুসন্ধানী মন, যাকে ভারতীয় ঐতিহ্যে বলা হয়েছে ‘ছাত্র’, আর পাশ্চাত্যে বলা হয়েছে ‘student’। ছাত্র শব্দের মূল ‘ছাত্র’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ধাতু ‘ছদ্’ থেকে, যার অর্থ আচ্ছাদন করা, সুরক্ষা দেওয়া বা আশ্রয় প্রদান করা। ধাতুর সঙ্গে ‘ত্র’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে তৈরি হয়েছে ‘ছাত্র’ — অর্থাৎ, “যে গুরুর ছায়ায় থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে।” এখানে আরও একটি গভীর অর্থ লুকিয়ে আছে — ‘ছত্র’ মানে ছাতা, অর্থাৎ আশ্রয়। যেভাবে ছাতা বৃষ্টির থেকে রক্ষা করে, ঠিক তেমনই গুরু জ্ঞানের ছত্রছায়ায় শিষ্যকে অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে রক্ষা করেন। তাই ছাত্র মানে — যে গুরুদেবের ছত্রছায়ায় থেকে জ্ঞান গ্রহণ করে, নিজেকে শুদ্ধ করে এবং আলোকিত করে। Student শব্দের মূল ‘Student’ শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ ‘Studēre’ থেকে, যার অর্থ — to be eager, to strive after, to devote oneself; অর্থাৎ, যে ব্যক্তি জ্ঞানলাভের জন্য গভীর আগ্রহে নিজেকে উৎসর্গ করে। এরও মূল উৎস প্রোটো–ইন্দো–ইউরোপীয় ধাতু ‘steu–’, যার অর্থ — আগ্রহে তাড়িত হয়ে এগিয়ে যাওয়া, অনুসন্ধানে মগ্ন থাকা। অতএব, Student মানে — “যে ব্যক্তি জ্ঞানের পথে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিবেদিত করে, এবং শেখাকে কর্তব্য নয়, বরং সাধনা হিসেবে গ্রহণ করে।” দুই শব্দের ভাবগত মিল একদিকে ছাত্র বোঝায় আশ্রয়, অন্যদিকে student বোঝায় অনুসন্ধান। দুটি শব্দ মিলিয়ে তৈরি হয় জ্ঞানের পূর্ণ বৃত্ত — আশ্রয় + অনুসন্ধান = শিক্ষা। ছাত্র নিজেকে গুরুর সান্নিধ্যে বিনয়ীভাবে সমর্পণ করে, আর student নিজের অন্তরের অন্ধকার ভেদ করে জ্ঞানের আলোর দিকে এগিয়ে যায়। দুজনেই চলেছে একই পথে — আত্মজ্ঞান ও সত্যের সন্ধানে। দার্শনিক দৃষ্টিতে সংস্কৃত বলে — “গুরোঃ অধীনোভবতি ছাত্রঃ।” অর্থাৎ, “যে গুরুর অধীনে শিক্ষা গ্রহণ করে, সেই ছাত্র।” পাশ্চাত্য দর্শন বলে — “A student is one who strives with devotion.” দুটি বাক্যই এক সার্বজনীন সত্য প্রকাশ করে — যে জ্ঞানের পথে নিবেদন ও বিনয়কে একত্র করে, সে-ই সত্যিকারের শিক্ষার্থী। উপসংহার ছাত্র শেখায় আশ্রয় নেওয়া — student শেখায় অনুসন্ধান করা। দু’টি একত্রে শেখায় জ্ঞানের পূর্ণতা। যখন একজন ছাত্র হয়ে ওঠে student, আর এক student হয়ে ওঠে চিরন্তন ছাত্র, তখনই তার ভেতরে জন্ম নেয় সত্যিকারের শিক্ষা। তখন সে কেবল তথ্য মুখস্থ করে না, বরং জ্ঞানের আলোয় নিজের পথ খুঁজে নেয়।