Tag: culture

  • #মহাবিশ্বের_রেসিপি

    মহাবিশ্বের_রেসিপি

    বিগ ব্যাংয়ের পর থেকেই এই মহাবিশ্বের রান্নাঘরে যেন একটা বিশাল ধরনের রান্না শুরু হয়েছে। শুরুতে উপকরণ ছিল খুবই সামান্য – একটু পদার্থ, একটু শক্তি, একটু টান, একটু আলো। তারপর সময় যত গড়াতে লাগল, রান্নাঘর ততই বড় হতে লাগল। নানা রকমের মালমশলা দিয়ে ভরতে থাকল ঘর। প্রথমে পরমাণু এল, তারপর নক্ষত্রের উনুনে নতুন নতুন মৌলের রুটি সেঁকা হতে থাকল। কোথাও গ্যালাক্সি তৈরি হচ্ছে, কোথাও গ্রহ ঠান্ডা হচ্ছে, কোথাও জল জমছে।

    তারপর সেই বিশাল হাঁড়িতে রান্না করা হলো জীবন। প্রথমদিকে রেসিপিটা ছিল খুব সাদামাটা – আহার, নিদ্রা, মৈথুন, ভয়। খাও, ঘুমাও, বংশ বাড়াও, বিপদ দেখলে পালাও। ব্যস। বেঁচে থাকাটাই ছিল পুরো রান্নার মূল কথা।
    কিন্তু জীবন তো থেমে থাকার জিনিস নয়। সে নিজেকে দিয়েই নিজের ওপর পরীক্ষা চালাতে থাকল। কোথাও স্নায়ুতন্ত্র একটু জটিল হলো, কোথাও মস্তিষ্কে একটু বেশি ভাঁজ পড়ল, কোথাও স্মৃতি চলে এল, কোথাও দল বেঁধে থাকার বুদ্ধি গজিয়ে ওঠলো।

    কোটি কোটি বছর ধরে নাড়াচাড়া করতে করতে একদিন এমন এক প্রাণী উঠে এল, যে শুধু বেঁচে থাকার জন্য বাঁচে না – সে এটাও জানে যে, সে বেঁচে আছে। আর তখনই রান্নাটা পাল্টে গেল। ক্ষুধা আর শুধু ক্ষুধা রইল না, সেটা রন্ধন হয়ে গেল। মিলন আর শুধু বংশবৃদ্ধি রইল না, সেটা প্রেম হয়ে গেল। সন্তান আর শুধু বংশধারা রইল না, সেটা মমতা হয়ে গেল। ভয় আর শুধু পালানোর সংকেত রইল না, সেটা ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনায় পরিণত হয়ে গেল।

    এরপর জীবন আকাশের দিকে তাকাল। জিজ্ঞেস করল, “ওখানে কী আছে ?” এই প্রশ্নের উত্তরে সে দূরবীন বানাল। আবার জিজ্ঞেস করল, “এই সব এল কী করে ?” প্রশ্ন থেকেই অঙ্ক কষল, পরীক্ষা করল, বিজ্ঞান তৈরি হয়ে গেল। তারপর একদিন প্রশ্নটা ঘুরে নিজের দিকেই ফিরে এল – “আমি কে ?” এবার রেসিপিতে ঢুকে পড়ল চেতনা।

    কিন্তু শুধু জানলেই তো হয় না, অনুভবও করতে হয়। তাই সেই অদৃশ্য রাঁধুনি এবার হাঁড়িতে ঢালল কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, দুঃখ, আনন্দ, বিরহ, আশা, হতাশা, কৌতূহল, ভালোবাসা।
    এবার মহাবিশ্ব শুধু একা থাকল না। কেউ তার রূপ দেখে মুগ্ধ হতে থাকল, কেউ তার রহস্য নিয়ে ভাবতে থাকল, কেউ কবিতা লিখতে লাগল, কেউ গান গাইতে লাগল, কেউ নক্ষত্র গুনতে লাগল। আর এসবের মধ্যেই কেউ একদিন প্রশ্ন করে বসল – “কিছুই না থাকার বদলে এত কিছু কেন আছে ?”
    মনে হয়, তখন সেই অদৃশ্য রাঁধুনি হাঁড়ির ঢাকনা তুলে একটু চেখে দেখে মুচকি হেসে বলল – “হুম… এবার স্বাদটা জমে উঠেছে !”

    কিন্তু রেসিপি এখনও শেষ হয়নি। জঙ্গলে আজ আর বাঘ নেই, কিন্তু আমাদের শরীরে আজও বাঘ দেখার ভয়টা রয়ে গেছে। একসময় বাঘের হাত থেকে বাঁচতে যে শরীর কর্টিসল হরমোন ছেড়ে দিয়ে রক্তের গ্লুকোজ বাড়িয়ে দিত – আজ সেই একই শরীর একটা ফোন কল, একটা ই-মেইল কিংবা একটা দুশ্চিন্তাতেও ইমার্জেন্সী মুডে চলে যায়।

    আসলে বিবর্তন কোনোদিনই ফাইনাল রেসিপি লিখে দিয়ে বসে যায়নি। পরিবেশ বদলেছে, জীবন বদলেছে, শরীর বদলেছে, মস্তিষ্ক বদলেছে – রেসিপিও বদলেছে। আর সেই বদল এখনও চলছে।
    হয়তো একদিন মানুষ নিজের শরীরটাকেই নতুন করে লিখতে শিখবে। বার্ধক্য, রোগ, ভয় – এসবের সঙ্গে তার সম্পর্ক বদলে যাবে। হয়তো পৃথিবী ছাড়িয়ে অন্য কোনো গ্রহে গিয়ে নতুন করে চুলো বসাবে, নতুন পরিবেশে নতুন রেসিপির পরীক্ষা করবে।

    তবুও একটা প্রশ্ন থেকেই যাবে – এই যে এতসব রান্না হচ্ছে, এত পদ বদলাচ্ছে – এগুলো খাচ্ছে কে ? নাকি রাঁধুনি আর ভোক্তা সেই একই ? নাকি সেই অদৃশ্য রাঁধুনি নিজেকেই নিজে চেখে দেখছে – কখনও একটু নুন বাড়িয়ে, কখনও ঝাল কমিয়ে, কখনও তেতো, কখনও মিষ্টি করে ? কে জানে….!

    হয়তো বিগ ব্যাং ছিল উনুন ধরানো। জীবন ছিল রান্নার জটিলতা। চেতনা ছিল সেই স্বাদ বোঝার জিভ। আর বিবর্তন ? সে তো এখনও মাঝে মাঝেই হাঁড়ির ঢাকনা তুলে উঁকি দিয়ে বলে – “আর একটু মশলা লাগবে ?” রান্না এখনও চলছে। জানি না এর শেষ কোথায়….!

  • গোমাতা আমাদের, গোমুত্র আমেরিকার !



    ভারতবর্ষের হাজার বছরের শাস্ত্রে গোমূত্রকে বলা হয়েছে “অমৃততুল্য”। দেহশুদ্ধি, অগ্নিদীপন, রক্তপরিশোধন – এই তিন ক্ষমতার জন্য গোমূত্রকে স্থান দেওয়া হয়েছে আয়ুর্বেদের মূল শিরায়। আধুনিক গবেষণায় তো জানা গেছে আমাদের স্বদেশী গোমুত্রের মধ্যে এমন কিছু ভালো ব্যাকটেরিয়া ও এনজাইম রয়েছে যেগুলো মানুষের গাট হেলথের জন্য একেবারেই অমৃত।
    আমাদের পূর্বপুরুষরা কোনো ল্যাবরেটরির রিপোর্ট ছাড়াই শুধু প্রকৃতির ভিতর দিয়ে, উপলব্ধির শক্তিতে, এই জিনিসের গুণ চিনে ফেলেছিলেন।

    কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, আমাদের দেশেরই কিছু মানুষ আজ গোমূত্রের নাম শুনলেই মুখ বিকৃত করে। যেন নিজের শিকড় ভুলে যাওয়া এক সমাজ – যার কাছে নিজস্ব জ্ঞানই ‘বোকামি’, আর বিদেশীরা যা বলে সেটাই ‘বিজ্ঞান’। একটি রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে সমালোচনা করতে গিয়ে স্বদেশের একটি মহান ঔষধি সম্পদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো – এটা কোন ধরনের রাজনীতি ?
    সবচেয়ে বিদ্রূপের বিষয় হলো, যে গোমূত্রকে নিয়ে ভারতীয় বুদ্ধিজীবীরাই কটাক্ষ করে, সেই গোমূত্র থেকেই যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর আগে পেটেন্ট তুলে নিয়েছে। হ্যাঁ, একদম সত্যি কথা এটা। তাও এক নয়, একাধিক গোমুত্রের পেটেন্ট এখন আমেরিকার হাতে। গোমূত্রের বায়ো-অ্যাকটিভ অংশ, ডিস্টিলেট, এবং অ্যান্টিবায়োটিক বুস্টার হিসেবে ব্যবহারের claim, এসবের ওপর একাধিক পেটেন্ট তারা লুফে নিয়েছে। অর্থাৎ, যা আমরা অবহেলা করি, তাকেই তারা গবেষণা করে, কাগজে-কলমে চিহ্নিত করে, আইন দিয়ে নিজেদের নামে লিখিয়ে নিয়েছে।

    আর আমরা ? আমরা নিজের জ্ঞান সম্পদকে “গোবর-গোমূত্র” বলে ঠাট্টা করি। কারণ গোমুত্র তো গরুর বর্জ্য পদার্থ ! অথচ চরম সত্যি কথা হলো— আমাদের দেশের গোমাতার জাত (দেশি প্রজাতির গরু) এর জৈব রাসায়নিক গঠন
    ইউরোপীয়/আমেরিকান গরুর থেকে আলাদা। এটাই কারণ, আয়ুর্বেদ কেবল “গোমূত্র” বলে না;
    দেশি গোমূত্র বলে। পৃথিবীর অন্য দেশের গরুর মূত্রে এমন ঔষধি গুণ নেই বলেই পেটেন্ট নেওয়া হয়েছে বিশেষভাবে Indian cow urine distillate–এর ওপর।

    এটাই আমাদের দুর্ভাগ্য, যা বিদেশীরা বুঝেছে,
    আমরা বুঝিনি। আজ যারা গোমূত্রকে অবজ্ঞা করে, তারা হয়তো জানেই না যে তাদের এই উপহাসই বিদেশি ল্যাবকে আমাদের জ্ঞান লুঠ করতে আরও সাহসী করে তুলেছে।
    ভারত সবই হারায়; কারণ ভারত নিজের জ্ঞানকে বিশ্বাস করে না। আর এই পোস্টের শেষে একটা কথাই বলতে চাই – যেদিন ভারত নিজের আয়ুর্বেদ, নিজের গরু, নিজের প্রকৃতি, নিজের শাস্ত্রকে সম্মান করতে শিখবে, সেদিন বিদেশের পেটেন্টের দরকারই পড়বে না। অমৃতকে অমৃত ভাবতে হলে
    মাথা নয়, চিত্ত বদলাতে হবে।

  • ছাত্র বা Student শব্দের প্রকৃত অর্থ কী ?








    ছাত্র ও Student — দুই শব্দ, এক আত্মা | Yogi Krishnadev Nath

    ছাত্র ও Student — দুই শব্দ, এক আত্মাগুরু ও শিষ্যের সম্পর্ক
    মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে শিক্ষা কখনো কেবল পুঁথিগত বিষয় ছিল না, বরং তা ছিল এক সাধনা — আত্মাকে শুদ্ধ করার, সত্যকে উপলব্ধি করার। এই সাধনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এক অনুসন্ধানী মন, যাকে ভারতীয় ঐতিহ্যে বলা হয়েছে ‘ছাত্র’, আর পাশ্চাত্যে বলা হয়েছে ‘student’।
    ছাত্র শব্দের মূল
    ‘ছাত্র’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ধাতু ‘ছদ্’ থেকে, যার অর্থ আচ্ছাদন করা, সুরক্ষা দেওয়া বা আশ্রয় প্রদান করা। ধাতুর সঙ্গে ‘ত্র’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে তৈরি হয়েছে ‘ছাত্র’ — অর্থাৎ, “যে গুরুর ছায়ায় থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে।”
    এখানে আরও একটি গভীর অর্থ লুকিয়ে আছে — ‘ছত্র’ মানে ছাতা, অর্থাৎ আশ্রয়। যেভাবে ছাতা বৃষ্টির থেকে রক্ষা করে, ঠিক তেমনই গুরু জ্ঞানের ছত্রছায়ায় শিষ্যকে অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে রক্ষা করেন। তাই ছাত্র মানে — যে গুরুদেবের ছত্রছায়ায় থেকে জ্ঞান গ্রহণ করে, নিজেকে শুদ্ধ করে এবং আলোকিত করে।
    Student শব্দের মূল
    ‘Student’ শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ ‘Studēre’ থেকে, যার অর্থ — to be eager, to strive after, to devote oneself; অর্থাৎ, যে ব্যক্তি জ্ঞানলাভের জন্য গভীর আগ্রহে নিজেকে উৎসর্গ করে।
    এরও মূল উৎস প্রোটো–ইন্দো–ইউরোপীয় ধাতু ‘steu–’, যার অর্থ — আগ্রহে তাড়িত হয়ে এগিয়ে যাওয়া, অনুসন্ধানে মগ্ন থাকা।
    অতএব, Student মানে — “যে ব্যক্তি জ্ঞানের পথে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিবেদিত করে, এবং শেখাকে কর্তব্য নয়, বরং সাধনা হিসেবে গ্রহণ করে।”
    দুই শব্দের ভাবগত মিল
    একদিকে ছাত্র বোঝায় আশ্রয়, অন্যদিকে student বোঝায় অনুসন্ধান। দুটি শব্দ মিলিয়ে তৈরি হয় জ্ঞানের পূর্ণ বৃত্ত — আশ্রয় + অনুসন্ধান = শিক্ষা।
    ছাত্র নিজেকে গুরুর সান্নিধ্যে বিনয়ীভাবে সমর্পণ করে, আর student নিজের অন্তরের অন্ধকার ভেদ করে জ্ঞানের আলোর দিকে এগিয়ে যায়। দুজনেই চলেছে একই পথে — আত্মজ্ঞান ও সত্যের সন্ধানে।
    দার্শনিক দৃষ্টিতে
    সংস্কৃত বলে — “গুরোঃ অধীনোভবতি ছাত্রঃ।” অর্থাৎ, “যে গুরুর অধীনে শিক্ষা গ্রহণ করে, সেই ছাত্র।”
    পাশ্চাত্য দর্শন বলে — “A student is one who strives with devotion.” দুটি বাক্যই এক সার্বজনীন সত্য প্রকাশ করে — যে জ্ঞানের পথে নিবেদন ও বিনয়কে একত্র করে, সে-ই সত্যিকারের শিক্ষার্থী।
    উপসংহার
    ছাত্র শেখায় আশ্রয় নেওয়া — student শেখায় অনুসন্ধান করা। দু’টি একত্রে শেখায় জ্ঞানের পূর্ণতা।
    যখন একজন ছাত্র হয়ে ওঠে student, আর এক student হয়ে ওঠে চিরন্তন ছাত্র, তখনই তার ভেতরে জন্ম নেয় সত্যিকারের শিক্ষা। তখন সে কেবল তথ্য মুখস্থ করে না, বরং জ্ঞানের আলোয় নিজের পথ খুঁজে নেয়।

    ✍️ — Yogi Krishnadev Nath
    🌐 Visit ykdonline.in